প্রতিবেদন লেখার কৌশল (নবম - দশম শ্রেণি)
প্রকাশ: জানুয়ারি ৩০, ২০২৬
ইদানীং প্রতিবেদন লেখা নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে দুশ্চিন্তায় ভুগতে দেখা যায়। প্রতিবেদন লেখার নিয়ম-কানুন ঠিকমতো না জানার কারণে তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে। এই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করার উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখার অবতারণা। আশা করি, নবম - দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এই লেখা থেকে কিছুটা হলেও উপকৃত হবে। অনুগ্রহ করে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়বে।
প্রতিবেদন কী
‘প্রতিবেদন’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো বিবরণী। শব্দটি ইংরেজি Report শব্দের বাংলা পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে এটি আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবেদন বলতে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয় সম্পর্কে অনুসন্ধানমূলক ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্যসমৃদ্ধ বিবৃতিকে বোঝায়।
যিনি প্রতিবেদন রচনা করেন, তাঁকে বলা হয় প্রতিবেদক।
এক কথায় বলা যায় কোনো একটি ঘটনা বা বিষয়কে সুশৃঙ্খলভাবে, তথ্যভিত্তিক ও সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করাকেই প্রতিবেদন বলে।
সংবাদপত্রের খবর, টেলিভিশনের সংবাদ এসবই একেকটি প্রতিবেদন। এছাড়াও স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, চাকরিক্ষেত্র, অভিযোগ তদন্ত কিংবা সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদান-প্রদানে প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবেদনের প্রকারভেদ
প্রতিবেদন প্রধানত দুই প্রকার:
- সংবাদ প্রতিবেদন
- প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন
১. সংবাদ প্রতিবেদন
সাধারণত নাগরিক জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দুর্ঘটনা বা কোনো নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক বিবৃতিকে সংবাদ প্রতিবেদন বলা হয়। এই ধরনের প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য হলো পাঠককে অবহিত করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
সংবাদ প্রতিবেদনে অবশ্যই থাকতে হবে
ক) শিরোনাম (সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয়)
খ) প্রতিবেদকের নাম ও ঠিকানা
গ) ঘটনার স্থান
ঘ) তারিখ ও সময়
নমুনা শিরোনাম
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি শহর সম্পর্কে প্রতিবেদন
এরপর মূল প্রতিবেদনে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা থাকবে। সবশেষে প্রতিবেদকের নাম, ঠিকানা, স্থান, তারিখ ও সময় উল্লেখ করতে হবে।
নবম - দশম শ্রেণির বোর্ড বইয়ে মূলত এই ধরনের প্রতিবেদনই অন্তর্ভুক্ত।
২. প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন
সংবাদ প্রতিবেদন ছাড়া অন্যান্য সব প্রতিবেদনই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনের অন্তর্ভুক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে।
১) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন
বিদ্যালয় বা কলেজে সংঘটিত কোনো ঘটনা বা আয়োজন সম্পর্কে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক বা কর্মচারী যখন প্রধান শিক্ষকের নিকট প্রতিবেদন পেশ করেন, তখন তাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন বলা হয়। এই প্রতিবেদন প্রধান শিক্ষকের বরাবর লিখতে হয়।
নমুনা কাঠামো :
তারিখ : ——
প্রধান শিক্ষক,
——— বিদ্যালয়, কুমিল্লা।
বিষয় : বিদ্যালয়ে আয়োজিত —— সম্পর্কে প্রতিবেদন।
সূত্র : ——
জনাব,
সম্প্রতি বিদ্যালয়ে আয়োজিত —— সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশ করার নির্দেশ অনুযায়ী নিচে তা উপস্থাপন করা হলো —
এরপর মূল প্রতিবেদন।
২) তদন্ত প্রতিবেদন
তদন্ত প্রতিবেদন সাধারণত দুই প্রকার
ক) প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন : কোনো প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।
খ) পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন : মামলা বা জিডির প্রেক্ষিতে পুলিশ কর্তৃক প্রস্তুতকৃত তদন্ত প্রতিবেদন।
৩) কারিগরি প্রতিবেদন
ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা, গবেষণা, শিল্পকারখানা, সেতু নির্মাণ ইত্যাদি কারিগরি বিষয় সম্পর্কিত প্রতিবেদনকে কারিগরি প্রতিবেদন বলা হয়। সাধারণত একই পেশার বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন।
৪) বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন
কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কর্মদক্ষতা ও আচরণ সম্পর্কে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যে প্রতিবেদন তৈরি করেন, তাকে বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন বলা হয়। এটি সাধারণত পদোন্নতির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
৫) দাপ্তরিক প্রতিবেদন
সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যে প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়, তাকে দাপ্তরিক প্রতিবেদন বলা হয়।
নমুনা কাঠামো :
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
শিক্ষা মন্ত্রণালয়
—— এর কার্যালয়
(ওয়েবসাইটের ঠিকানা)
স্মারক নং : —— তারিখ : ——
বিষয় : —— সম্পর্কে প্রতিবেদন।
এরপর মূল প্রতিবেদন।
৬) আর্থিক প্রতিবেদন (অডিট)
কোনো প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে আর্থিক বা অডিট প্রতিবেদন বলা হয়।
এছাড়াও গবেষণামূলক প্রতিবেদন, নির্বাহী প্রতিবেদন, সাময়িক প্রতিবেদন, বিধিবদ্ধ প্রতিবেদন, নিয়মিত প্রতিবেদন, কোম্পানি প্রতিবেদন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন রয়েছে।
ভালো মানের প্রতিবেদন লেখার জন্য যা মনে রাখতে হবে
প্রতিবেদন সংক্ষিপ্ত ও তথ্যপূর্ণ হতে হবে।
তথ্য হতে হবে নির্ভুল, নির্দিষ্ট ও সহজ ভাষায় উপস্থাপিত।
প্রতিবেদনে অবশ্যই একটি শিরোনাম থাকবে।
শিরোনাম আকর্ষণীয় ও বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ব্যক্তিগত মতামত বা আবেগ পরিহার করতে হবে।
প্রতিবেদন লেখার সময় অনুসরণযোগ্য কৌশল
পরিকল্পনাঃ প্রতিবেদন লেখার আগে বিষয় ও প্রতিবেদনের ধরন নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো গুরুত্ব অনুযায়ী সাজাতে হবে।
সংহতিঃ অপ্রাসঙ্গিক বর্ণনা পরিহার করে প্রয়োজনীয় তথ্যই উপস্থাপন করতে হবে।
নিরপেক্ষতাঃ প্রতিবেদককে নিরপেক্ষ থাকতে হবে এবং সব পক্ষের বক্তব্য সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরতে হবে।
পর্যাপ্ত তথ্যঃ কখন, কোথায়, কী, কেন, কীভাবে এবং কারা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রতিবেদনে থাকতে হবে।
ভাষাঃ প্রতিবেদনের ভাষা হবে সহজ, সরল ও স্পষ্ট। এতে দুর্বোধ্য, অস্পষ্ট কিংবা দ্ব্যর্থবোধক শব্দের ব্যবহার করা উচিত নয়।
অনুচ্ছেদঃ প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গের জন্য আলাদা অনুচ্ছেদ ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়। একই অনুচ্ছেদে একাধিক বা ভিন্ন ধরনের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করা উচিত নয়।
সূত্র নির্দেশঃ প্রতিবেদনে অবশ্যই যথাসম্ভব সর্বজনস্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে তথ্য উপস্থাপন করতে হয়। সূত্র উল্লেখ না থাকলে প্রতিবেদনটি পাঠকের কাছে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে মনে হতে পারে।
সঙ্গতি রক্ষাঃ প্রতিবেদন অবশ্যই নির্ধারিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রচিত হতে হবে। প্রতিবেদক কোনো অবস্থাতেই মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারবেন না।
প্রযুক্তির সহায়তাঃ প্রয়োজনে ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ড প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা যেতে পারে।
প্রতিবেদন লেখার কৌশল নিয়ে শেষ কথা
নিয়ম মেনে, নিরপেক্ষভাবে এবং সংক্ষিপ্ত ভাষায় প্রতিবেদন লিখতে পারলে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব। নিয়মিত অনুশীলনই একজন ভালো প্রতিবেদক হওয়ার মূল চাবিকাঠি।
Labels: শিক্ষা